টোকন ঠাকুর লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
টোকন ঠাকুর লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

নিঃসঙ্গের ছদ্মবেশে - টোকন ঠাকুর

মানুষের ছদ্মবেশে থাকি, আদতে রাক্ষস!

একদিন রাক্ষসপুরীতে ছিলাম। কিন্তু রাক্ষসদের সঙ্গে আমার বনিবনা হতো না। সবসময় খিটিমিটি লেগে থাকত। ভালোবেসে যে রাক্ষুসী আমার পাশে ছায়াচ্ছন্ন দাঁড়িয়েছিল, এক সন্ধ্যার অজান্তে তাকে অন্য রাক্ষসেরা ভক্ষণ করে ফেলেছিল। মনের দুঃখে, স্বপক্ষত্যাগী আমি মানুষের ছদ্মবেশে মানবসমাজে চলে এসেছি। আমিও কবিতা লিখি...

এই হচ্ছে মানুষের মধ্যে থেকেও আমার নিঃসঙ্গতার সংগোপন ইতিহাস। এই হচ্ছে মানুষের সমাবেশে থেকেও আমার মানুষ হতে না পারার ইহলৌকিক যন্ত্রণা। কারণ, সৌন্দর্যলুব্ধক এক মোমের মানবীকে ভালোবাসতে গিয়ে সম্পূর্ণ ভুলে গিয়েছিলাম যে, আমি গোত্রান্তরিত রাক্ষস। স্বগোত্রে আমার জন্য এক রাক্ষুসী আত্মাহূতি দিয়েছিল। আর এদিকে আমি মোমের মানবীতে হাত ধরে আবেগে-আবেগে- যেই বলেছি, রাক্ষুসী, প্রিয়ে, তোমাকেই আজ ভালোবাসি, তুমি আমার পাশে দাঁড়াও; কিন্তু সে ভয় পেয়ে ছিটকে পালায়, আর

রাক্ষসের ভয়ে মানবীরা চিরকাল ভীত বলে আমি নিঃসঙ্গ হয়ে যাই, যথাক্রমশ নিঃসঙ্গ হয়ে উঠি। নিঃসঙ্গতা এমন একটি উদাহরণ, যে-কেউ গ্রহণে অনিচ্ছুক... হায় রে এমন নিঃসঙ্গ থাকি

সকাল থেকেই একটা শালিক কার্নিশে ভিজছে- স্থিরচিত্রে, নিঃসঙ্গের ছদ্মবেশে আমি এখন ওই ভেজা শালিক পাখি

শালিকের ছদ্মবেশে কবিতা লিখি!

পাখি সম্পর্কিত শেষ কবিতা - টোকন ঠাকুর

প্রেম হলে সেই পাখি, যার সোনালি ডানা ছুঁয়ে দেখবার সৌভাগ্য পাওয়া চাই। যার একটি মায়াবী পালক খসিয়ে নিতে ইচ্ছে করে। প্রেম সেই পাখি, যার চোখের মণিতে সামুদ্রিক নৌকার মাস্তুল দেখা যায়। যার মসৃণ গ্রীবায় নিঃসন্দেহে রোমিও-জুলিয়েট মঞ্চস্থ হতে পারে। প্রেম সেই পাখি, যার ঠোঁট দেখলেই প্রতীয়মাণ হয়- একজন একা মানুষের আত্মজীবনী কী ভয়ঙ্কর পিপাসার্ত! বীভৎস!

যখনই কেউ প্রেমে পড়ে মানে সেই পাখিতে পড়ে। তখন সে প্রেমরূপ পাখির ডানা ছুঁতে চায়। কারণ, তার অবচেতন মন প্রার্থনা করে ডানার নিচে আত্মগোপন। একুশ শতকের জ্বালায় জ্বলেও প্রেমে এরকম আত্মগোপন এখনো উঠে যায়নি। কিন্তু হঠাৎ কোনো পাখি যখন উড়ে যায়, ডানার নিচের ওমে যে আত্মগোপনকারী সে ধপ করে পড়ে যায়। নিঃশব্দে শব্দ হয়, ধপাস!

অর্থাৎ পাখি উড়ে গেলেই প্রেম উড়ে যায়। সেই প্রেম সেই পাখি আর সন্ধান করেও পাওয়া যায় না। এরপর যত পাখি চোখে পড়ে, সব অন্য পাখি। কোনোভাবেই আমি ভুলতে পারি না, সেই পাখি কোথায় গেল- যার অপরিসীম ডানার নিচে একদিন আত্মগোপনে ছিলাম, ওম সম্মেলন করেছিলাম...

আজ যেসব পাখি ওড়াউড়ি করছে, ডালে বসে আলস্য ভাঙছে- এরা তো জানেই না যে, প্রকাশ্যে ঘোরাঘুরি করলেও আমি আত্মগোপনে থাকতে ভালোবাসি। ফলে, এখন আমি বুঝতেই পারছি না, কোন পাখিটার ডানার নিচে ওম্ সম্মেলন সফল হবে, সার্থক হবে?

কোন পাখিটা উড়বে না আর, স্বভাব ভেঙে?

গোধূলিকল্যাণ সংঘের কবিতা - টোকন ঠাকুর

একদিন, ধুলো নিয়ে মুঠো মুঠো কবিতা লিখেছি।
একবার, কাব্যসমালোচনা করতে গিয়ে, আমারই লেখক-বন্ধু, লিখল:
...কবি, মরমী প্রণেতা; কিন্তু তার একটি কবিতার মধ্যেই চব্বিশবার
ধুলো পাওয়া গেছে...’

তাই তো! একটিমাত্র কবিতা পড়তে গিয়ে, যদি চব্বিশবার
ধুলো ঢুকে পড়ে চোখে, নাকে, মুখে
এটা কে সহ্য করবে? কোন দুঃখে?

তারপরও তলে তলে, আমি কিন্তু ধুলোচর্চা করেই চলেছি।
রিয়েলি, আমি এখনো ধুলোর মধ্যেই গেরুয়া সম্ভাবনা
দেখতে পাচ্ছি;
যেমন, প্রত্যেক জোছনাতেই আমি লক্ষ্য করছি-
গৃহত্যাগ কীরূপে জরুরি?
ধুলোকে মাঝেমধ্যে, ধূলি নামেও ডেকেছি। কেননা
আমার মনে পড়েছে, সন্ধ্যার সামান্য আগে, ধুলোর মধ্যে
হাঁটতে হাঁটতে গরু খেদিয়ে বাড়ি ফিরছি
এবং হাই ইশকুলে ওঠার কিছুদিন পর, আমি জানলাম
গোধূলি: হোয়াটস্ কলড্ গোধূলি?

আমি গোধূলির প্রেমে পড়ে যাই! কিন্তু একদিন
সেই গোধূলিকে আমি হারিয়ে ফেলি
এবং আমি শহরে চলে আসি এবং আমি
গোধূলির কথা ভাবতে ভাবতে, ধূলিমলিন হয়ে যাই;

ভবা, সাধে কি আর ধূলিবিদ্যা শিখি?

এবং আজ, ধূলিতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত। রাস্ট্রের যে কোনও ফাইলে
যে কোনও সমীক্ষায় ধুলো ঢুকে গেছে।
এদিকে আমি, গোধূলি হারানো কবি
প্রতিদিন সন্ধ্যার আগে, ঝাঁপ খুলে বসে থাকি
প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এক
গোধূলিকল্যাণ সংঘের...

কবিতা বিক্রির কবিতা - টোকন ঠাকুর

যে যাই বলুক, আমি বিবাহিত
বাতাসি বেগম আমার বউ।
আমাদের সুখের সংসার; যাচ্ছে! বেশ
ঢিলিমিলিই তো যাচ্ছে।
কিন্তু মাঝেমধ্যেই ঝামেলা বাঁধিয়ে দিচ্ছে
আমার পুত্ররা, কন্যারাও। তাদের ভাষ্য-
তারা নাকি দুধেভাতে নেই
আমি অসমর্থ পিতা?
আমি নাকি তন্দ্রা ধরে বলি:
‘এই নে, হাটে নিয়ে বেশি দামে বেঁচে আয়
আত্মায় প্রণীত আমাদের টাটকা কবিতা’

বলেন, একজন স্বায়ত্বশীল, বিবাহিত লোক
এসব বলতে পারে?
কিন্তু আমার পুত্র-কন্যারা এত বেয়াড়া আর
বিপ্লবী যে
ওরা লিভটুগেদার চায়, ওরা ভাইবোনেরাই
দিব্যি অভিসারে...
ফলে, আমার দিব্যভাবনা বাড়ে

সিদ্ধান্তে আসি, আমি ওদের নাম রেখেই কি
ভুল করেছি?
পুত্রদের নাম রেখেছি বাক্য; প্রথমটা প্রথম বাক্য
তারপরেরটা দ্বিতীয় বাক্য, তিন নাম্বারে তৃতীয় বাক্য!
কন্যাদের নাম রেখেছি ওদের মা’র নাম অনুসারেই-
‘হাওয়া’
বড়টা দস্যিহাওয়া, মেঝটা শান্তভারি, তারপর হিমেলহাওয়া
এবং কদিন আগেই যে জন্মেছে, ওর নাম হুহুমনা,
আজকাল তো হুহুমনাহাওয়ার জন্যই আমার এত টান
এত ভালবাসার গান!
কিন্তু প্রণীত বাক্য, মাই সন
এন্ড প্রণীত হাওয়া, মাই ডটার-
আজকাল কারওর আচরণই আমার আর ভালো লাগছে না

চতুর্থ বাক্য ঘরে ফিরছে না পাঁচদিন,
হাওয়াদের মধ্যেও একজনকে পাওয়া যাচ্ছে না;
বধু আমার বাতাসি বেগম পালিয়ে গেছে
অথচ আমি বিবাহিত... অযোগ্য এক পিতা!

আমি নাকি সন্ধ্যা দেখেই বলি:
এই নে, সূর্যাস্তের একটু আগের আকাশ থেকে
পেড়ে আনা, দগ্ধীভূত, লালচে কবিতা;
এটা ঠিকই বিক্রি হয়ে যাবে
গ্রন্থে গ্রন্থে, প্রত্যন্তে-
নিয়ে যা, হাটে নিয়ে যা

গলির মোড়ে খাম্বা,খাম্বায় বাড়িভাড়া সাবলেট,পড়াইতে চাই,বটিকা লিপিডিশ, ঘটক ও কাজি অফিস ইত্যাদি

এক অজ্ঞাতনামা চাইনিজ কবির কবিতা আমার ভালো লেগে যায়
মনে ধরে যায়

"চা দে, দুধচিনি বাড়ায়ে দিস..." বলেই টি-স্টলে দাঁড়ানো কবি যেদিকে তাকায়
সেদিকেই প্রেমিকার বাড়ি

বাড়ির ছাদে নাইলনের টান টান দড়ি
কবি সেই টান টান দড়ির দিকেই নেত্র মেলে থাকে...

কবির বিবৃতি: দড়িতে চুলের ফিতা শুকোনো দেখে
আমার মনে ভার্মিলিয়ন ভাব জমে খুব, খুব

দড়িতে যখন দেখি, উনার ওড়না-কামিজ রোদে পুড়ে যাচ্ছে
সেই পোড়নে তখন আমার ভালোবাসা ফাল দে ওঠে, ডিগবাজি খায়

আর যখন দড়িতে দোলে তোমার ভেজা পায়জামা/ সায়া
তক্ষুণি মনে হয়, পায়জামা/ সায়া শুকিয়ে ওঠার আগেই
তোমাকে আমি বিয়ে করে ফেলি

দেরি করলে ফেরি মিস হবে...

উত্তরের হাওয়া- টোকন ঠাকুর

কার কথা কীভাবে বলব আমি?

বন থেকে প্রকাশিত দৈনিক ঝরাপাতা—কারা তাতে লেখে আর কারাই বা পাঠক-পাঠিকা? কার কাছে বলা যায়—উত্তরের হাওয়া আসে গুপ্তচর হয়ে? সন্ধে থেকেই ওঁত্ পেতে বসে আছে আততায়ী ঘ্রাণ, চন্দ্রমল্লিকার! মনে হয়, ভাবনা সম্প্রচার কেন্দ্রের আজ রজতজয়ন্তী, তুমুল ভাবনাসূচি...ভাবনাকে দেখতে আসে বুদ্বুদ—দোস্তে দোস্তে জুয়া খেলে কয়েক সেকেন্ড; এর মধ্যেই ঝাঁপ দেয় গনগনে কবিতাখসড়া, এর মধ্যেই উঁকি দিয়ে যায় এক স্বর্ণমৃগয়া, নড়ে ওঠে ঝোপঝাড়, যেহেতু সতর্ক...পদবুলি বাইপাস করে ছুটতে থাকি ছুটতে ছুটতে ছুটতে ছুটতে বনবনানির নির্জনতায় যেখানে এলাম—ওহ কী দুরবস্থা, নিজেই রচনা করেছি সুনিপুণ আত্মঘাতী ব্যাকরণ—আমি এই জঙ্গলের গাছে গাছে ফেরার কোনো চিহ্ন এঁকে রেখে আসিনি, কীভাবে ফিরব? আমি কি আজ অরণ্যমন্ত্রী? না, আমি এই বনবাস উদ্যাপন করছি না। হাওয়া-বাতাসের অর্কেস্ট্রায় এই মর্মর কম্পোজিশন আমার ভালো লাগছে না। আমি জানি, এক দিগ্বালিকা বড় হচ্ছে ঘরের মধ্যে, রাতে; বাইরে বসন্তপূর্ণিমা, বাইরে অঙ্গার বৈরাগীর গান—পাতা-টাতা নাই বনে, ভালোবাসি তোমারে, হরিণেরা কি জানে, ভালোবাসি তোমারে...? ঘরের মধ্যে বড় হচ্ছে বালিকা, বালিকারা বড় হচ্ছে কার জন্যে—এই প্রশ্ন কোনো প্রশ্নই হয়ে উঠত না, যদি, আমাদের কবিতার চেয়ে করে আসা লোকাচার, ধর্মাচার, তদীয় গ্রন্থাচার বড় না হতো! আমি জানি এক দিগ্বালিকা বড় হচ্ছে ঘোরের মধ্যে, ঘরের মধ্যে, জনপদে। সে বালিকা জানে তার ভালোবাসা সেই ডালিম, ধীরে ধীরে বড় হয়, লুব্ধক প্রেমিকের হাতে পড়লেই পাকা ডালিমটা ফেটে যায়, পাকা ডালিম ফাটা ডালিম ভেতরটা দেখিয়ে দেয়...আমি সেই ফলের রসময়ী দানাগুচ্ছ থেকে বহুদূরে এক স্বর্ণমৃগয়ার খপ্পরে পড়ে এই বনভূমির মধ্যে...আজ আর এই গ্রিন অভিবাস পছন্দ করছি না।

যদিও কোকিল ডাকছে, এতে পরিস্থিতির আরো অবনতি হচ্ছে, স্বাভাবিকতার পতন ঘটছে। এ সময় কবিতা লিখতে ইচ্ছে করে, এ সময় উত্তরের হাওয়া আসে গুপ্তচর হয়ে, দক্ষিণের বারান্দায় ওঁত্ পেতে বসে থাকে আততায়ী ঘ্রাণ, চন্দ্রমল্লিকার...মনে হয়, শিহরণ শব্দের অর্থ বুঝতেই দিগ্বালিকা আজ আর স্কুলে যাবে না, কিন্তু স্কুলে যাবার নাম করে সে ঠিকই বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়বে...

শিহরণ, তোর কথা কীভাবে লিখব আমি?